বিসিএসে পরীক্ষকদের সময় বেঁধে দেওয়ায় সুফল মিলছে  

বিসিএসে পরীক্ষকদের সময় বেঁধে দেওয়ায় সুফল মিলছে  

বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) যে সময় বেঁধে দিচ্ছে, সেই সময়ের মধ্যেই পরীক্ষকেরা খাতা জমা দিচ্ছেন। আর এর সুফলও পেতে শুরু করেছে পিএসসি। আগের তুলনায় কম সময়ে খাতা মূল্যায়নের কাজ শেষ হচ্ছে।

পিএসসি বলছে, এই সুফল শুধু পিএসসি নয়, পরীক্ষার্থীরাও পাচ্ছেন। খাতা মূল্যায়নে কম সময় লাগায় বিসিএসের ফল প্রকাশেও কম সময় লাগবে বলে মনে করছে পিএসসি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিএসসির পরীক্ষা-সংক্রান্ত শাখায় কর্মরত একজন কর্মকর্তা বলেন, ৪৩তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন শুরুর আগে পরীক্ষকদের ভুল সংশোধন করার উদ্যোগ নেয় পিএসসি। ভবিষ্যতে যাতে পরীক্ষকেরা খাতা মূল্যায়নে ভুল না করেন, সে জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। উদ্যোগের পরও যদি কোনো পরীক্ষক ভুলের পুনরাবৃত্তি করেন, তাহলে তাঁকে পরীক্ষকদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নেয় পিএসসি।

পিএসসি পরীক্ষকদের ভুল কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিশেষ একটি সেমিনার করে। ওই সেমিনারে তালিকা করে পরীক্ষকদের পিএসসিতে ডাকা হয়। বিসিএসের পরীক্ষক হিসেবে এই সেমিনারে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়। সেখানে থাকা পরীক্ষকেরাই মূলত ৪৩তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করার সুযোগ পান।

পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের সময় যাতে আগের পরীক্ষকদের করে যাওয়া ভুল আবার আর না হয়, সে জন্য পিএসসি এ বিশেষ উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে পিএসসির মিলনায়তনে সেমিনারে পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের জন্য একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দেখানোর ব্যবস্থা করা হয় পরীক্ষকদের। সেখানে চাকরিপ্রার্থীদের নাম-পরিচয় গোপন রেখে পরীক্ষা হয়ে যাওয়া বিভিন্ন ধরনের খাতা দেখানো হয়। এ ছাড়া পরীক্ষকেরা যেসব ভুল সবচেয়ে বেশি করেন, সেগুলো চিহ্নিত করে দেখানো হয়। যেসব ভুল করা যাবে না, সেগুলোও দেখানো হয়। যেসব খাতায় পরীক্ষক অনেক ভুল করেছেন, সেসব খাতায় ভুলগুলো চিহ্নিত করা হয়। এগুলো কেন ও কীভাবে ভুল, তা প্রেজেন্টেশনে দেখানো হয়। সেমিনারে প্রতিদিন ১০০ পরীক্ষক অংশ নেন। একই ভুল যদি কোনো পরীক্ষক আবার করেন, তাহলে তাঁদের পরীক্ষক হিসেবে আর পিএসসিতে রাখা হবে না বলেও সেমিনারে বলে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই সময় পিএসসির চেয়ারম্যান সোহরাব হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘লিখিত পরীক্ষায় পরীক্ষকেরা বেশি ভুল করেন ও খাতা দেখতে বেশি সময় নেন। আমরা এই সময় কমিয়ে আনতে চাই। এ জন্য বিশেষ সেমিনারের ব্যবস্থা করেছি। সেখানে একটি গাইডলাইন দেওয়া হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, এখানে অংশ নেওয়া পরীক্ষকেরা নিজেরা লাভবান হবেন। একই সঙ্গে পরীক্ষার্থীরাও লাভবান হবেন। ফল প্রকাশে সময় কম লাগবে। সব পরীক্ষককে ডাকা হচ্ছে, যাঁরা উপস্থিত থাকবেন, শুধু তাঁদেরই খাতা দেখতে দেওয়া হবে। অন্য যাঁরা অনুপস্থিত থাকবেন, তাঁরা কোনোভাবেই খাতা পাবেন না।’

সেমিনারের পর সুফল পাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে পিএসসির একজন কর্মকর্তা বলেন, খাতা মূল্যায়নে প্রথম পরীক্ষকদের যে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তাঁরা সেই সময়েই খাতা দিয়ে দ্বিতীয় পরীক্ষক হিসেবে খাতা নিয়ে গেছেন। আগে অনেকে খাতা মূল্যায়নে দেরি করতেন আবার জমা দিতে গড়িমসি করতেন। কিন্তু সময় বেঁধে দেওয়া ও সময়মতো খাতা মূল্যায়নে ব্যর্থ হলে তাঁদের আর পরীক্ষক হিসেবে না রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়ায় পরীক্ষকেরা সচেতন হয়েছেন। এখন সময়মতোই খাতা দিচ্ছেন। ৪৩তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ফল এ কারণে আগেই দেওয়া যাবে। এ ছাড়া ৪৪তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ফলও নির্ধারিত সময়েই দেওয়া যাবে। এটির সুফল মূলত চাকরিপ্রার্থীরা পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে বিসিএস শেষ হতে যে সময় কম লাগবে, এটা তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আনন্দ কুমার বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘৪৩তম বিসিএসে পরীক্ষকেরা যথাসময়েই খাতা মূল্যায়ন করছেন। দ্বিতীয় পরীক্ষকেরা খাতা মূল্যায়ন করছেন, সেটিও শেষ পর্যায়ে। আমরা ভুল শোধরাতে যে সেমিনার করেছিলাম তার সুফল মিলেছে।’

পিএসসি সূত্র জানায়, ৪১তম বিসিএসের ফল দেরি হওয়ার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে পিএসসি। ফল দেরির কারণ হিসেবে তদন্ত কমিটি ৩১৮ পরীক্ষকের গাফিলতি বা দায়িত্ব অবহেলার প্রমাণ পায়। পরীক্ষকদের এমন অবহেলা কীভাবে কমানো যায়, সে জন্য তদন্ত কমিটি বেশ কিছু সুপারিশ করে। সেই সুপারিশের অংশ হিসেবে পিএসসি বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে।

৪১তম বিসিএসের ফল দেরির জন্য গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেউ কেউ পরীক্ষার্থীর কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তরের জন্য নম্বরই দেননি। অনেকে খাতার শেষে থাকা প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন। কোনো কোনো খাতায় পরীক্ষক নম্বরের যোগফলে ভুল করেছেন। অনেকে আবার এমনভাবে নম্বর দিয়েছেন, যা পুনর্মূল্যায়নের জন্য তৃতীয় পরীক্ষকের কাছে পাঠাতে হয়েছে।

লিখিত পরীক্ষার খাতা যেসব পরীক্ষককে দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের অনেকে ঠিক সময়ের মধ্যে খাতা মূল্যায়ন শেষ করতে পারেননি উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ছয় মাসে ১০০ খাতার মধ্যে মাত্র ১৫টি মূল্যায়ন করেছিলেন। কয়েক দফা সময় নিয়ে যখন খাতা জমা দিয়েছেন, তাতেও অনেক ত্রুটি থেকে যায়। এসব ত্রুটিপূর্ণ খাতা যাচাই করে কমিটি দেখেছে, ৩১৮ জন পরীক্ষক দায়িত্বে অবহেলা করেছেন।

কমিটি সম্প্রতি যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, তাতে ফল প্রকাশে দেরি হওয়ার জন্য পরীক্ষকদের দায়িত্বে গুরুতর অবহেলার প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘দায়িত্বে ভয়াবহ অবহেলা’ হিসেবে।

Leave a Reply