প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস সমালোচনার মুখে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন

প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস সমালোচনার মুখে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করবেন বলে জানিয়েছেন। গতকাল বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ঘোষণায় তিনি জানান, আগামী জুন মাসের শেষ নাগাদ তিনি বিশ্বব্যাংকপ্রধানের পদ ছাড়বেন। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করেননি ম্যালপাস। খবর বিবিসি ও রয়টার্সের।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পছন্দের ব্যক্তি ছিলেন ডেভিড ম্যালপাস। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ট্রাম্পই বিশ্বব্যাংকের প্রধান হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি অস্বীকার করা ও আরও কিছু কারণে বেশ সমালোচিত ব্যক্তি তিনি।

২০১৯ সালের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকে নিয়োগ পাওয়া ডেভিড ম্যালপাসের পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৪ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা। এর প্রায় এক বছর আগেই তিনি ওই পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন বলে জানান। এক বিবৃতিতে ম্যালপাস বলেন, ‘অনেক চিন্তার পরে আমি নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, গত মঙ্গলবার মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি জ্যানেট ইয়েলেনকে পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন ম্যালপাস। এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি তাঁর সিদ্ধান্তের কথা জানান।

ট্রাম্প প্রশাসনে মার্কিন অর্থ বিভাগে আন্তর্জাতিক–বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ম্যালপাস। এরপর ২০১৯ সালের এপ্রিলে তিনি বিশ্বব্যাংকের দায়িত্ব পান। এর আগে তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অধুনালুপ্ত বিনিয়োগ ব্যাংক বিয়ার স্টার্নসের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করেছিলেন।

জলবায়ু পরিবর্তন ও অন্যান্য বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক যে পদ্ধতিতে বৃহত্তর ঋণ প্রদান কর্মসূচি পরিচালনা করে, তা পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন ডেভিড ম্যালপাস। এ নিয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি ইয়েলেনের কাছ থেকে অব্যাহত চাপের মধ্যে রয়েছেন তিনি।

এ ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণায়ন (গ্লোবাল ওয়ার্মিং) নিয়ে বিজ্ঞানীদের মতের সঙ্গে তিনি একমত পোষণ করেন কি না, তা বলতে ব্যর্থ হওয়ায় ম্যালপাসের সমালোচনা করেছিল হোয়াইট হাউস। তাঁকে দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করা নিয়েও নেতিবাচক মনোভাব ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের।

অবশ্য পদত্যাগের কথা জানানোর পর মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি ইয়েলেন এক বিবৃতিতে ম্যালপাসকে তাঁর কাজের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, রাশিয়ার আক্রমণের মুখে ইউক্রেনের প্রতি তাঁর দৃঢ় সমর্থন, আফগানিস্তানের জনগণকে সহায়তা করার জন্য অবদান রাখা ও স্বল্প আয়ের লোকদের সাহায্য করার উদ্যোগের জন্য বিশ্ব উপকৃত হয়েছে।

ইয়েলেন আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই ম্যালপাসের স্থানে নতুন কাউকে মনোনীত করবে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বোর্ড পরবর্তী প্রেসিডেন্টের জন্য স্বচ্ছ, যোগ্যতাভিত্তিক ও দ্রুত মনোনয়নপ্রক্রিয়া শুরু করবে বলে তিনি তাঁর প্রত্যাশার কথা জানান।

ম্যালপাসের চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, আগামী জুনে অর্থবছর শেষ হবে। সে সময়ে ম্যালপাসের চলে যাওয়াটা ইতিবাচক হবে। কারণ, আগামী অক্টোবরে মরক্কোয় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তখন ম্যালপাসের উত্তরসূরি প্রয়োজনীয় সংস্কার উদ্যোগে অংশ নিতে পারবেন।

কে হচ্ছেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট

দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য অনুসারে মার্কিন সরকার বিশ্বব্যাংকের প্রধান হিসেবে একজনকে বাছাই করে। আর ইউরোপীয় নেতারা নির্বাচন করেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধানকে।

অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালের ওয়াশিংটন কার্যালয়ের প্রধান নাদিয়া দার মনে করেন, বিশ্বব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়াতে হলে প্রেসিডেন্ট নিয়োগের প্রক্রিয়াটি আরও বেশি প্রার্থীর জন্য উন্মুক্ত করা উচিত। এক টুইটার পোস্টে তিনি বলেন, অংশীদারেরা যদি সত্যিই বিশ্বব্যাংকের ‘বিকাশ’ করতে চান, তাহলে একটি উন্মুক্ত ও যোগ্যতাভিত্তিক নির্বাচনপ্রক্রিয়ার ভিত্তিতে ম্যালপাসের উত্তরাধিকারী নিয়োগ করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট পদে অন্তত দুজন শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছেন বলে মনে করছে রয়টার্স। তাঁদের একজন সামান্থা পাওয়ার, যিনি বর্তমানে ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের (ইউএসএআইডি) নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ ছাড়া বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ে জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

অন্যজন হলেন রাজীব শাহ। তিনিও ওবামা প্রশাসনের অধীন ইউএসএআইডির প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বর্তমানে তিনি রকেফেলার ফাউন্ডেশন নামে একটি জনহিতকর গোষ্ঠীর প্রেসিডেন্ট।

জলবায়ু পরিবর্তনের তাপ বিশ্বব্যাংকের পদে

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশগুলো বেশ সরব। সেখানে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর সময়ে মনোনীত বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ম্যালপাস যেন অনেকটা বিপরীতমুখীই ছিলেন। ফলে, ট্রাম্পের চলে যাওয়ার পরে বিশ্বব্যাংকের প্রধানের পদে এমন কাউকে প্রত্যাশা করা হচ্ছিল, যিনি জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করবেন এবং এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারও করবেন।

এতে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বব্যাংকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাসের ওপর চাপ বাড়ছিল। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে জাতিসংঘ, অন্য বিশ্বনেতা ও পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলো এই চাপ তৈরি করে। যেমন ২০২১ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের মহাসচিবের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা সেলউইন হার্ট বলেন, উন্নয়নশীল বিশ্ব যখন জ্বলছে, তখন বিশ্বব্যাংক প্রত্যাশামতো কাজ করছে না।

ম্যালপাসের ওপর নতুন করে আবার চাপ তৈরি হয় গত বছরের সেপ্টেম্বরে। তখন জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ঐকমত্যে বিশ্বাস করেন কি না—এমন প্রশ্নের ঠিক কোনো উত্তর দিতে ব্যর্থ হন তিনি। সে সময় হোয়াইট হাউস থেকে নিন্দা করা হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথাই জানালেন ম্যালপাস।

পরিবেশবাদী দলগুলো ম্যালপাসের প্রস্থানে বেশ খুশি হয়েছে। গ্লোবাল পাবলিক ফাইন্যান্স ক্যাম্পেইনের সহব্যবস্থাপক ব্রনওয়েন টাকার বলেন, এটি দুর্দান্ত খবর। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অস্বীকারকারী এই ব্যক্তির চেয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট পদে আরও খারাপ ব্যক্তি ভাবা কঠিন।

বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, ম্যালপাস ২০২১ সালে ৫ লাখ ২৫ হাজার মার্কিন ডলার নিট বেতন পেয়েছেন। এ ছাড়া পেনশন ও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে ব্যাংক থেকে ৩ লাখ ৪০ হাজার ডলারের বেশি পেয়েছেন তিনি।

বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২২ অর্থবছরে সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন প্রকল্পে ১০ হাজার ৪০০ কোটি (১০৪ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের বেশি ব্যয়ের জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

Leave a Reply