মার্কিন প্রযুক্তি খাত-ছাঁটাই হওয়া এক–তৃতীয়াংশ কর্মী ভারতীয়

মার্কিন প্রযুক্তি খাত-ছাঁটাই হওয়া এক–তৃতীয়াংশ কর্মী ভারতীয়

সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল গুগলের ভারতীয় প্রকৌশলী ব্যবস্থাপক ৩১ বছর বয়সী আবিরের (ছদ্মনাম)। তাঁর কর্ম মূল্যায়ন শুরু হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়ার মাঝামাঝি পর্যন্ত যেতেই চাকরি হারাতে হয় তাঁকে। পুরো ঘটনা অনেকটা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো।
কারণ হিসেবে আবির বলেন, ছাঁটাই শুরু হওয়ার আগে তেমন কিছুই জানা যায়নি। এমনও হয়েছে, যাঁরা গত অক্টোবরে পদোন্নতি পেয়েছিলেন, তাঁরাও ছাঁটাই হয়েছেন। খবর ইকোনমিক টাইমসের।

আবিরের মতো আরও অনেক ভারতীয় ও বিদেশি নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন মানুষদের জন্য প্রযোজ্য এইচ-১বি ভিসা নিয়ে কাজ করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিধি বাম। চাকরি তো গেছেই, তার ওপর এখন যদি তাঁরা দুই মাসের মধ্যে নতুন কাজ খুঁজে না পান বা অভিবাসনের শ্রেণি পরিবর্তন করতে না পারেন, তাহলে মার্কিন মুলুকই যে ছাড়তে হবে। ফলে স্বপ্নের আমেরিকা ছাড়ার ভয়ে অনেকেই এখন শঙ্কিত।

মার্কিন সরকারের সূত্রে ইকোনমিক টাইমস জানাচ্ছে, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যত বিশেষ ভিসার অনুমোদন হয়েছে, তার ৭৫ শতাংশই পেয়েছেন ভারতীয়রা। অর্থাৎ সে দেশে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের বড় অংশই ভারতীয়। স্বাভাবিকভাবে এই ছাঁটাই প্রক্রিয়ায় যাঁরা কাজ হারিয়েছেন, তাঁদের বড় অংশও ভারতীয়। বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে বলা হয়েছে, গত বছর থেকে এ পর্যন্ত যে দুই লাখ মানুষ সে দেশের প্রযুক্তি খাতে ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন, তার এক-তৃতীয়াংশই ভারতীয়।

এইচ-১বি ভিসায় মাইক্রোসফটে কাজ করা আরেক ভারতীয় কর্মী সীতা (ছদ্মনাম) বলেন, ‘১৮ জানুয়ারি জানিয়ে দেওয়া হয়, আমার আর চাকরি নেই। আমি সন্তানকে নিয়ে এখানে থাকি। ছেলেকে হাই স্কুলে ভর্তি করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় চাকরি চলে যাওয়া প্রকৃতপক্ষেই খুব কষ্টকর।’

জানা যায়, গ্লোবাল ইন্ডিয়ান টেকনোলজি প্রফেশনালস অ্যাসোসিয়েশন ও ফাউন্ডেশন ফর ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ডায়াস্পোরা স্টাডিজ (এফআইআইডিএস) চাকরিচ্যুত ভারতীয় নাগরিকদের সহায়তায় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসের (ইউএসসিআইএস) নীতিনির্ধারক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সঙ্গে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এফআইআইডিএস। তাদের মূল লক্ষ্য, চাকরি হারানোর পর দুই মাসের প্রেস পিরিয়ডের মেয়াদ বাড়ানো। অর্থাৎ কাজ না পেলে যেন ভারতীয় উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের ৬০ দিনের মধ্যে যেন তল্পিতল্পা গোছাতে না হয়।

তবে এল-১ ভিসা নিয়ে যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে আছেন, তাঁদের অবস্থা আরও শোচনীয়। এইচ-১বি ভিসাধারীরা অন্য শিল্পে বা কম বেতনে কাজ নিতে পারেন। কিন্তু এল-১ ভিসাধারীরা মূলত বহুজাতিক কোম্পানির মার্কিন কর্মী-ব্যবস্থাপক ও নির্বাহী পদে কর্মরত। ফলে তাঁদের কাজের অনুমতি খুবই সীমিত কিছু ক্ষেত্রের জন্য প্রযোজ্য।

চাকরিচ্যুত ভারতীয় আইটি কর্মীদের সহায়তায় অনেকগুলো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়েছে। প্রতিটি গ্রুপে আট শতাধিক আইটি কর্মী আছেন। যুক্তরাষ্ট্রে যখন যে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে বা শূন্য পদের বিজ্ঞাপন হচ্ছে, সেগুলোর তথ্য তাঁরা নিজেদের মধ্যে প্রচার করছেন।

অন্য কিছু গ্রুপে বিভিন্ন ভিসার বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসন আইনজীবী চাকরি হারানো ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায় বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছেন।

কেন এই ছাঁটাই
মহামারির সময় বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরে থেকে কাজ করেছেন। ফলে তখন প্রযুক্তির চাহিদা হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে যায়। অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে ২০২০ সালের জুন থেকে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে বিপুল কর্মী নিয়োগ দেয় বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি। তখন তাদের মুনাফাও হয়েছে বিপুল। কিন্তু এখন চাহিদা কমে যাওয়ায় কর্মীদের বিদায় করা হচ্ছে।

তবে ঋণমান নির্ণয়কারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ফিচ রেটিংসের মার্কিন আঞ্চলিক অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ওলু সিনোলা সম্প্রতি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থানের হার মহামারির আগের সময়ের তুলনায় এখনো ৮ শতাংশ বেশি। এর অর্থ হলো ২০২১ ও ২০২২ সালে প্রযুক্তি খাতে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’

সেই সঙ্গে এখন চলছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগ। চ্যাটজিপিটি মানুষের ঘুম হারাম করে দিচ্ছে। এআই নিয়ে শুরু হয়েছে মাইক্রোসফট ও গুগলের লড়াই। সবাই এ খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। সে জন্যও কর্মীদের ছাঁটাই করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও ছাঁটাই হওয়ার আশঙ্কা আছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও মানুষের অনেক কাজ কেড়ে নেবে, এমন আশঙ্কা আছে। সব মিলিয়ে কাজের জগতে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

Leave a Reply