তলানিতে রাশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি সম্পর্ক

তলানিতে রাশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি সম্পর্ক

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের এক বছর

পূর্ব ইউরোপের দেশ ইউক্রেনে রুশ আক্রমণের এক বছর পূর্তি হচ্ছে আজ। এ যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। বিশ্বমন্দার আশঙ্কা করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের জ্বালানি সম্পর্ক ভেঙে পড়েছে। রাশিয়ার দাবি, পশ্চিমা তথা যুক্তরাষ্ট্রের উসকানিতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। খবর: রয়টার্স, আল জাজিরা।

জানা যায়, কয়েক দশক ধরে খুব সূক্ষ্মভাবে ইউরোপের সঙ্গে তেল ও গ্যাস বাণিজ্য গড়ে তুলেছিল রাশিয়া। এটি ছিল দেশটির রাজস্ব আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবাহ। কিন্তু গত বছর ইউক্রেনে আক্রমণের পর এ বাণিজ্যিক সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। এখন এ সম্পর্ক এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, অদূর ভবিষ্যতে যেখান থেকে রাশিয়ার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুব একটা দেখছেন না বিশ্লেষকরা।

এক বছর আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের নির্দেশে প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করে তার সেনাবাহিনী। এরপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ইউরোপে সরবরাহ উল্লেখযোগ্য কমিয়ে ফেলার সিদ্ধান্তে হ্রাস পায় রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি।

সর্বোচ্চ মূল্য বেঁধে দেয়াসহ সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার তেল বাণিজ্য আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু গ্যাসের চেয়ে অপরিশোধিত ও শোধন করা তেলের বিকল্প বাজার খুঁজে পাওয়া সহজ দেশটির জন্য।

ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়ার গ্যাস বাণিজ্যের ভিত্তি হলো হাজার মাইল পাইপলাইন, যা সাইবেরিয়া থেকে শুরু হয়ে জার্মানি হয়ে ইউরোপের অপর দেশে পৌঁছেছে। গত বছরের আগ পর্যন্ত পশ্চিমা ক্রেতারা রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রমের এক সাবেক সিনিয়র ম্যানেজার নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে আরও বলেছেন, হাজারো মানুষের পরিশ্রমে কয়েক দশকে নির্মিত রপ্তানি ব্যবস্থা এখন একেবারে ভেস্তে গেছে। তবে বর্তমান কর্মকর্তারা বলছেন, এটি স্বাভাবিক বাণিজ্য।

রপ্তানি ফি ও রপ্তানির পরিমাণের ভিত্তিতে রয়টার্সের প্রাক্কলন হলো ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে গ্যাজপ্রমের বিদেশিদের কাছে বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার কম। রপ্তানির পূর্বাভাস ও গ্যাসের গড় মূল্য বিবেচনায় নিলে এ বছর গ্যাজপ্রমের আয় হবে প্রায় অর্ধেক। এতে করে জানুয়ারিতে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।

ইউরোপীয় কমিশন প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লিয়েন ধারণা করছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর আট মাসের মাথায় ইউরোপে গ্যাস সরবরাহের ৮০ শতাংশ কমিয়েছে রাশিয়া। এর ফলে পশ্চিম ইউরোপের চাহিদার বিপরীতে রাশিয়া মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করেছে। ২০২১ সালে রাশিয়া ৪০ শতাংশ চাহিদা মিটিয়েছিল।

রাশিয়া থেকে বাল্টিক সাগর হয়ে জার্মানি পর্যন্ত বিস্তৃত নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনে রহস্যময় বিস্ফোরণে গত বছর মস্কোর গ্যাস সঞ্চালনের সক্ষমতা কমেছে। বিস্ফোরণগুলোর জন্য রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলো একে অপরকে দায়ী করেছে।

১৯৬৬ সালে সোভিয়েত পলিটব্যুরো পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে পাইপলাইনের বদলে গ্যাস বিনিময়ের আলোচনা শুরু করে। এর ফলে ১৯৭০ সালে ‘গ্যাসের বিনিময়ে পাইপ’ চুক্তি হয়। গ্যাসের বর্তমান মূল্যের হিসাবে ২০ বছরের সরবরাহ চুক্তির আর্থিক মূল্য ছিল ৩০ বিলিয়ন ডলার। এর ফলে জার্মানি কয়েক দশক ধরে সাশ্রয়ী ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সুবিধা পায় এবং রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস বা মিথেনের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। গত বছর ঘাটতির আশঙ্কার কারণে রাশিয়ার জ্বালানির অর্থায়ন সুবিধা পেয়েছিল। ইউক্রেনে আক্রমণের কিছুদিনের মধ্যেই ইউরোপে গ্যাসের মূল্য বেড়েছিল রেকর্ড মাত্রায়। আন্তর্জাতিক বাজারেও সর্বকালের সর্বোচ্চ দামের কাছাকাছি পৌঁছায় তা। এর পর থেকে গ্যাস ও তেলের দাম কমতে শুরু করে এবং ডিসেম্বরে রুশ গ্যাসের জন্য পশ্চিমাদের সর্বোচ্চ দাম কার্যকর হয়েছে। এতে চলতি বছরের শুরুতে রাশিয়ার জ্বালানি আয় আরও কমেছে এবং কমবে।

Leave a Reply