৮,১৭৮ কোটি পাওনার মধ্যে ৩,৩৫৯ কোটি টাকাই ছাড়!

৮,১৭৮ কোটি পাওনার মধ্যে ৩,৩৫৯ কোটি টাকাই ছাড়!

৪ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা পরিশোধের শর্তে ঋণ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা এননটেক্স গ্রুপকে ৩ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা সুদ মওকুফ করেছে জনতা ব্যাংক। ‘ওয়ান টাইম এক্সিট’ নীতির আলোকে আলোচিত এ গ্রুপকে বিশাল অঙ্কের এ সুদ মওকুফ করা হয়েছে। জনতা ব্যাংকের ৭৪৬তম পর্ষদ সভায় সুদ মওকুফের এ অনুমোদন দেয়া হয়। জনতা ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক সুদ মওকুফ ও ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দেয়। এরপর নিজেদের ক্ষমতা বলে বিশাল অঙ্কের সুদ মওকুফ করে জনতা ব্যাংক। তবে এ পরিমাণ সুদ মওকুফের পরও এননটেক্স ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম হবে কিনা, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা।

জনতা ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, এননটেক্স গ্রুপের ১৮টি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রকল্প ঋণ, সিসি (হাইপো: টার্ম লোন) ও সৃষ্ট পিএডিসহ (টার্ম লোন) বর্তমানে ৮ হাজার ১৭৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা পাওনা জনতা ব্যাংকের। এর মধ্যে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ৪ হাজার ৮১৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা আদায় সাপেক্ষে ৩ হাজার ৩৫৯ কোটি ১৯ লাখ টাকার সুদ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত হয়। যার মধ্যে আরোপিত সুদের দুই হাজার ৮৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা (সাসপেন্স খাতে রক্ষিত সুদ)। আর অনারোপিত সাধারণ সুদের ১০০ শতাংশ বাবদ ৯৭২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা এবং অনারোপিত দণ্ড সুদের ১০০ শতাংশ বাবদ ৩০২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। সর্বমোট অনারোপিত সুদ এক হাজার ২৭৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা মওকুফ করা হয়। নির্ধারিত সময়ে এননটেক্স ৪ হাজার ১৭৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা পরিশোধ করতে না পারলে ঋণটি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে এবং তা পুনরায় বিএল মানে শ্রেণিকরণ করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান এসএম মাহফুজুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব ধরনের নিয়ম-নীতি মেনে এননটেক্সকে ঋণের সুদ মওকুফ করেছি। এতে আরোপিত, অনারোপিত বিভিন্ন ধরনের সুদগুলোকে এক্সিট পলিসির আওতায় সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সুদ মওকুফের পর পুরো দায়-দেনা পরিশোধ করলে জনতা ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। আমরা বছরের পর বছর ধরে এননটেক্সের ঋণ টাকা আদায় করতে পারিনি। অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন বা এনওসি (অনাপত্তি সনদ) নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

জনতা ব্যাংক ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এননটেক্স গ্রুপের ১৮টি কোম্পানির মধ্যে ৩ হাজার ৪১৭ কোটি ৯ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ করেছে, যা ঋণদাতার মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর অধীনে নির্ধারিত একক ঋণগ্রহীতার এক্সপোজার সীমা লঙ্ঘন করে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আসল ও সুদসহ বর্তমানে গ্রুপটির কাছে ৮ হাজার ১৭৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে জনতা ব্যাংকের। এর মধ্যে পূর্ণগঠিত ঋণ রয়েছে এক হাজার ১৯৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকার। গ্রাহক থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫৫২ কোটি ৯০ লাখ টাকা আদায় করেছে ব্যাংকটি। বিপুল পরিমাণ ঋণের টাকা কয়েক বছর আটকে থাকার পর এ সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাংকটি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, ঋণ পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুক এখন ব্যাংক নিজেরাই করে থাকে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো প্রকার অনুমোদন প্রয়োজন হয় না। কারণ ঋণ পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন রয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক শেয়ার বিজকে বলেন, ঋণ পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন রয়েছে। সে নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংক তার নিজস্ব বিবেচনায় সুদ মওকুফ করে থাকে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের এনওসি (অনাপত্তি সনদ) দরকার হয় না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনের ব্যত্যয় ঘটলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এক সময় জনতা ব্যাংক শিল্প খাত ও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল। ব্যাংকটির হাত ধরে দেশে অনেক শিল্পোদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন। দেশের প্রায় সব করপোরেট গ্রুপেই জনতা ব্যাংকের অর্থায়ন ছিল। আর বৈদেশিক বাণিজ্য বলতেই যেন ছিল জনতা ব্যাংক। কিন্তু ২০১৫ সালের প্রাক্কালে ব্যাংকটির করুণ আর্থিক পরিস্থিতি প্রকাশ হতে শুরু করে। ওই সময়ে বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও পরবর্তী সময়ে ক্রিসেন্ট ও এননটেক্সের অনিয়মের চিত্র প্রকাশিত হয়। এতে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে। এত পরিমাণ সুদ মওকুফের পরও ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারে বলে মনে করেন তারা।

জনতা ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি: গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের ঋণ বিতরণের পরিমাণ ৭৮ হাজার ৮৬৬ কোটি ২১ লাখ টাকা দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৩৮৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা মোট ঋণের ১৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। ২০১৭ সালের শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা।

এর আগে এননটেক্সকে সুবিধা দিতে ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পাঠিয়েছে জনতা ব্যাংক। পাশাপাশি তাদের খেলাপি ঋণের সুদ মওকুফেরও আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু নীতিবহির্ভূত হওয়ায় দুটি আবেদনই বাতিল করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুফ ব্যাংকের হাতে ছেড়ে দেয়। তারপর ৮ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা পাওনার মধ্যে ৩ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকার সুদ মওকুফের অনুমোদন দেয় জনতা ব্যাংক।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন রিপোর্টে উঠে এসেছে, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া কোম্পানি খুলে জনতা ব্যাংক থেকে এলসির (ঋণপত্র) টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এননটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউনুস বাদল। তিনি ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ৩ হাজার ৪১৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা বের করে নেন। ওই টাকার মধ্যে কিছু টাকা দিয়ে তিনি একটি ‘ডামি ফ্যাক্টরি’ নির্মাণ করেন। বাকি টাকা দেশের বাইরে পাচার করেন। একটি দেশে তিনি ‘সিসার’ বারও প্রতিষ্ঠা করেন। ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে তার বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি প্রচার করেন। আসলে তিনি বেশিরভাগ অর্থ পাচার করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

Leave a Reply