সংশোধিত এডিপির আকার ২ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা

সংশোধিত এডিপির আকার ২ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা

এনইসিতে অনুমোদন

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ২৭ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা, যা মূল এডিপি থেকে ১৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কম। এবার মূল এডিপির আকার ছিল দুই লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা করপোরেশনের প্রায় আট হাজার ৯৯৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এডিপিসহ সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার দাঁড়াবে দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫৬০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনইসি সম্মেলন কক্ষে গতকাল এনইসি সভায় সংশোধিত এ এডিপি অনুমোদন দেয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন এনইসি চেয়ারপার্সন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম। এ সময় পরিকল্পনা বিভাগের সচিব সত্যজিৎ কর্মকার, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. কাউসার আহাম্মদসহ পরিকল্পনা কমিশনের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতের পরিকল্পনা সচিব সত্যজিৎ কর্মকার বলেন, সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ মূল এডিপির তুলনায় ১৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে। এ বিষয়ে সরকার সজাগ আছে। সরকারি অর্থ ব্যবহারে সবাই দক্ষ। কারণ আমরা আমাদের দেশের আইন-কানুন জানি। কিন্তু বৈদেশিক ঋণ ব্যবহারে নানা জটিলতা আছে। কারণ বৈদেশিক ঋণ একেক দেশের একেক আইনে আসে। সচিব বলেন, এডিপি বরাদ্দের সরকারি অংশের অর্থ ব্যবহারে সক্ষমতা বাড়ছে। দেশি অর্থ খরচ সহজ। উন্নয়ন সহযোগীদের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা জটিল। সে কারণে বিদেশি ঋণের প্রাক্কলন ৯৩ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৭৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ-শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বরাদ্দ কমানোর কারণ জানতে চাইলে সত্যজিৎ কর্মকার বলেন, বিদ্যুৎ সার ও কৃষিতে যে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। তা সহনীয় পর্যায়ে রেখে কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আমরা এ বছর সমাপ্য ৩৪৭টি প্রকল্প দ্রুত শেষ করার জন্য পরামর্শ দিয়েছি সংশ্লিষ্টদের।

এদিকে বিদ্যুতের দাম পাঁচ শতাংশ বাড়ানো খুব বেশি নয় বলে দাবি করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম। তার দাবি, ‘ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে তা সহনীয় হয়। খুব বেশি চাপও পড়ে না।’ জানুয়ারি মাসের ধারাবাহিকতায় ফেব্রুয়ারিতেও নির্বাহী আদেশে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম পাঁচ শতাংশ বাড়িয়েছে সরকার।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাজেট ঘাটতি কমাতে হবে। আর বাজেটে ঘাটতি কমাতে হলে এটা (বিদ্যুতের দাম বাড়াতে) করতে হয়। ঘাটতি সহনীয় রাখতে হলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করতে হবে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব পড়বে না।’

শামসুল আলম বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতিতে বহু দিক থেকে চাপ আসতে পারে। আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।’

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির এডিপি আকার ছিল দুই লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা, সংশোধিত এডিপিতে যা কমে দাঁড়াচ্ছে দুই লাখ ২৭ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা করপোরেশনের প্রায় আট হাজার ৯৯৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এডিপিসহ সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার দাঁড়াবে দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫৬০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

তিনি বলেন, এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন এক লাখ ৫৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। বৈদেশিক অর্থায়ন ৭৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বৈদেশিক বরাদ্দ কমছে ১৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মূল এডিপিতে ছিল ৯৩ হাজার কোটি টাকা। সরকারের অর্থায়ন কমানো হয়নি। এক হাজার ৫২৫ প্রকল্পের বিপরীতে এ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ৩৫৩টি চলমান প্রকল্প চলতি অর্থবছরেই সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এনইসি সভায় দেয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তুলে ধরে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ফসল উৎপাদন বাড়াতে হবে। এক ইঞ্চি জমিও ফেলে রাখা যাবে না। প্রকল্প সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। জনবলের অভাবে প্রকল্পের নির্মাণকৃত ভবন পড়ে থাকে, সেই বিষয়টি খেয়াল রাখতে বলেছেন।’

সংকটের সময়েও বৈদেশিক ঋণের প্রকল্পে বরাদ্দ কমার বিষয়ে পরিকল্পনা সচিব সত্যজিৎ কর্মকার বলেন, এ বিষয়ে এনইসি সভায় আলোচনা হয়েছে। সভায় বৈদেশিক ঋণের প্রকল্পগুলোতে গতি বাড়ানোর বিষয়ে বলা হয়েছে, যাতে এই সংকটের সময়ে ডলার কাজে লাগানো যায়।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে সংশোধিত এডিপিতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর প্রকল্পগুলোয় যে চাহিদা ছিল, তার তুলনায় বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আরএডিপিতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর চাহিদা ছিল দুই লাখ ২৫ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। আর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দুই লাখ ২৭ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় দুই হাজার ৩১৭ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। তারা পেয়েছে ৩৯ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। ২৯ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা পেয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। ২৫ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা পেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। রেলপথ মন্ত্রণালয় পেয়েছে ১২ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় পেয়েছে ১১ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা।

তবে এমআরটি-৬, পদ্মা রেল সেতু ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও অন্য মেগা প্রকল্পগুলোয় বরাদ্দ কমেছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধন হলেও এ প্রকল্পে চলতে অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল দুই হাজার ২০২ কোটি টাকা, সংশোধিত এডিপিতে যা কমে হচ্ছে এক হাজার ৪০২ কোটি টাকা। দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য মূল এডিপিতে রাখা ছিল ১৩ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। তবে সংশোধিত এডিপিতে এ প্রকল্পে বরাদ্দ কমে হচ্ছে ১১ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। প্রকল্পটিতে বিদেশি অংশ কমেছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা, অন্যদিকে বেড়েছে দেশীয় অংশ।

জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দসহ অন্তর্ভুক্ত এক হাজার ৬২৭টি প্রকল্প রাখা হয়েছে, যার মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প এক হাজার ৪১০টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১১৫টি, নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প ১০২টি।

Leave a Reply