আমানত টানতে সুদহার বাড়াচ্ছে ব্যাংক

আমানত টানতে সুদহার বাড়াচ্ছে ব্যাংক

দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের সঞ্চয়ের ক্ষমতা কমেছে। অনেকে জমানো টাকা তুলে সংসার চালাচ্ছেন। অন্যদিকে কম সুদহারের কারণে মানুষ ব্যাংকে টাকা জমা রাখা কমিয়েছেন। সার্বিকভাবে ব্যাংক আমানতে প্রভাব পড়েছে। জানুয়ারিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের আমানত কমেছে এক হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ। এ অবস্থায় আমানতের সুদহার বাড়াচ্ছে অনেক ব্যাংক। ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদহারের সীমা বহালের মধ্যে আমানতে ৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে কোনো কোনো ব্যাংক। আমানত ও ঋণের সুদহার কাছাকাছি হওয়ায় আগামীতে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমে যাবে বলে আশঙ্কা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের।

ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংকের আমানত কমে যাওয়ার অন্যতম কারণÑআমানতের সুদহার এখন দেশে বিরাজমান মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহারও বাড়াতে পারছে না; কারণ ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্দিষ্ট করে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এখন কিছু ব্যাংক বাধ্য হয়ে আমানতের সুদহার হার বাড়াচ্ছে। এতে আমানত ও ঋণের সুদহার কাছাকাছি হয়ে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমছে। এ অবস্থা থাকলে আগামীতে ব্যাংকগুলো লোকসানের সম্মুখীন হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, গত ডিসেম্বরে ব্যাংক ব্যবস্থায় আমানত ছিল ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা কমে ১৪ লাখ ৮৮ কোটি ৪৪৭ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংক আমানত কমেছে এক হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কোন ব্যাংক কত সুদে আমানত নিচ্ছেÑপ্রতি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তা ঘোষণা দিতে হয়। সুদহার বাড়ালে বা কমালে নিজ ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও নোটিশ দিতে হয়। জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতের সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক মেয়াদি আমানতে ৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে। আগের মাসে যা ছিল সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ শতাংশ। ৮ শতাংশ সুদে আমানত নেয়া আরেকটি ব্যাংক পদ্মা। এক্সিম ব্যাংক জানুয়ারিতে মুনাফার হার বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করেছে। আগের মাসে যা সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ ছিল। এবি ব্যাংক জানুয়ারিতে মেয়াদি আমানতে সুদহার ঘোষণা করেছে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। আগের মাসেও যা সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ ছিল। আল-আরাফাহ্? ইসলামী ব্যাংক ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ করেছে।

জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, এটা আসলে সত্যি যে ব্যাংকগুলো স্বস্তিতে নেই। কারণ আমানত টানতে ব্যাংক সুদহার বাড়াচ্ছে। ফলে আমানত ও ঋণের ন্যূনতম পার্থক্য থাকছে না। এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংকগুলো মুনাফায় থাকবে না। তাই ঋণের সুদহার বাড়নো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী জাফর আলম শেয়ার বিজকে বলেন, আমানতের সুদহারের সীমা তুলে দেয়ার কারণে ব্যাংকগুলো নিজেদের বিবেচনায় রেট বাড়িয়েছে। এতে এক ব্যাংকের সঙ্গে অন্য ব্যাংকের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। ফলে আমানত ও বিনিয়োগের সুদহার কাছাকাছি চলে এসেছে। এ কারণে আমানত ও ঋণের সুদহারের পার্থক্য ৩ শতাংশ না হলে, ব্যাংকগুলোর মুনাফার হার কমবে। তাই ঋণের সুদহার কিছুটা বাড়ানো উচিত। আশা করি, বাংলাদেশ ব্যাংক এটা পজিটিভভাবে দেখবে।

আমানত কমে যাওয়ার ফলে কিছু ব্যাংক তহবিল সংকটে পড়েছে। তাই আমানত বাড়াতে না পেরে কোনো কোনো ব্যাংক ৯ শতাংশের বেশি সুদেও অন্য ব্যাংক থেকে টাকা ধার করছে। তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ধার করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ৫ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা ধার নিয়েছে। যার সুদহার ছিল ৬ থেকে ৭ শতাংশ। এছাড়া গতকাল এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংক কল মানিতে ৭ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা ধার করেছে। আর গত বৃহস্পতিবার এ ধারের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ২৩৭ টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামি ধারার একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও  প্রধান নির্বাহী শেয়ার বিজকে বলেন, অনেক ব্যাংকের সিআরআর ও এসএলআর রক্ষণাবেক্ষণ করতে সমস্যা হচ্ছে। আবার আমানতকারীদের টাকা দিতে কষ্ট হচ্ছে। এ জন্য তারা বেশি রেটে আমানত টানছে। শুধু আমানত রেট বৃদ্ধি নয়। বিভিন্ন ব্যাংক থেকেও বেশি সুদহারে ধার করছে। মূলত এসব ব্যাংক ঋণ সীমার বেশি ঋণ দিয়েছে। তাই এ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। আমানত বেশি রেটে নিলে সেটা মুনাফায় আঘাত আনবেই। কারণ আমানত ও ঋণের সুদহার কাছাকাছি হয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ প্রতিটা জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই যখন টাকার সংকট তৈরি হয়, তখন সুদহার বাড়িয়ে দিতে হয়। সুদহার বাড়িয়ে দিলে ঋণ কমে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক শিল্প প্রতিষ্ঠান বাঁচিয়ে রাখার জন্য সুদহার বাড়াচ্ছে না। ঋণের সুদহার না বাড়ালে আগামীতে ব্যাংকগুলোর অবস্থা খারাপ পর্যায় চলে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাংক খাতের চাহিদা আমানত বেশি কমেছে। গত ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে চাহিদা আমানত ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা। জানুয়ারিতে তা কমে ১ লাখ ৮০ হাজার ১৫৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মেয়াদি আমানত বেড়েছে। জানুয়ারি পর্যন্ত মেয়াদি আমানত ১৩ লাখ ৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ১৩ লাখ ৫ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা।

গত বছরের জানুয়ারিতে ব্যাংক খাতে আমানত ছিল ১৪ লাখ ২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে যা বেড়ে হয়েছে ১৪ লাখ ৮৮ কোটি ৪৪৭ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেকে খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন। মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক মানুষ নতুন করে সঞ্চয়ও করতে পারছেন না। এছাড়া কয়েকটি ব্যাংকের সম্পদ ব্যবস্থাপনার অনিয়ম সম্পর্কে তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর অনেক গ্রাহক এসব ব্যাংক থেকে টাকা সরিয়ে ফেলেন। তাই ব্যাংকের আমানত কমে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থা জোরদার ও অনিয়মের জন্য দায়ী ব্যাংক মালিক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর শেয়ার বিজকে বলেন, দুর্বল ও ঋণ অনিয়ম করা ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে। ভালো ব্যাংকের আমানত কমছে না। এসব ব্যাংকে বেশি সুদহার দিতে হচ্ছে না। মূলত দুর্বল ব্যাংকগুলো সুদহার বাড়াচ্ছে। যেটা আমনতকারীদের জন্য ঝুঁকি হতে পারে। এক্ষেত্রে দুর্বল ব্যাংকগুলো আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। কারণ তাদের ঋণ ও আমানতের সুদহারের পার্থক্য কম। তাই এসব ব্যাংকের মুনাফা কমবে, এটা স্বাভাবিক বিষয়।

Leave a Reply