দেশে ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে আস্থা বাড়ছে ব্যবসায়ীদের

দেশে ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে আস্থা বাড়ছে ব্যবসায়ীদের

দেশের ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে সামগ্রিকভাবে আস্থা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, আগামী ছয় মাস পর্যন্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ ভালো থাকবে। তবে তাদের মাঝে দুশ্চিন্তা রয়েছে উৎপাদনে ব্যবহার করা কাঁচামাল বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, অফিস ভাড়া ও অন্যান্য সরঞ্জামসংক্রান্ত মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে। ব্যবসাসয়ীদের নিয়ে করা বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড)- এর জরিপ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। গতকাল রোববার বিজনেস কনফিডেন্স সার্ভে রিপোর্ট ২০২২-২৩ (ব্যবসার আস্থা সূচক নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন) প্রকাশ করে সংস্থাটি। প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন।

মূলত বিল্ড ২০২২ সালের মার্চ থেকে আগস্ট ও  সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর মাসে দুই ধাপে দেশের আট বিভাগের মোট ৫৬৭টি প্রতিষ্ঠানের ওপর অনলাইনভিত্তিক প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে জরিপ চালিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করে; যেখানে ২৮৪টি প্রতিষ্ঠান ছিল উৎপাদনভিত্তিক ও ২৮৩টি ছিল সেবাভিত্তিক। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৮ শতাংশের অবস্থান ঢাকায়, বাকি ৫২ শতাংশ ঢাকার বাইরের।

প্রতিবেদনে বিল্ড বলছে, ২০২২ সালের মার্চ থেকে আগস্ট সময়ে করা এক জরিপে সামগ্রিকভাবে ব্যবসায় আস্থা পরিস্থিতির ইতিবাচক চিত্র দেখা গেলেও ব্যবসায়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা তৈরি পোশাক খাতের মতো বড় খাতকেও চাপে ফেলতে পারে। এ অবস্থায় ব্যবসার ব্যয় কমিয়ে আনতে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে পরামর্শ দিয়েছে বিল্ড। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২২ সালের জন্য সামগ্রিক বিজনেস কনফিডেন্স ইনডেক্স (বিসিআই) দাঁড়িয়েছে ৭৪ দশমিক ৪ পয়েন্ট। এ স্কোর চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত ব্যবসা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করে বিল্ড। জুন মাসের শেষে এসে সামগ্রিকভাবে ব্যবসার আস্থা সূচক ১০০ বেসিস পয়েন্টের মধ্যে ৭৮ দশমিক ২ পয়েন্ট স্কোর করতে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রকাশনা অনুষ্ঠানে মূল উপস্থাপনায় বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, বিজনেস কনফিডেন্স সার্ভেতে ছয় মাসের (ডিসেম্বর ২০২২ থেকে জুন ২০২৩) সময়কালের জন্য সেবা খাতের তুলনায় উৎপাদন খাতকে বেশি ইতিবাচক বলে মনে করা হচ্ছে। সেবা খাতের স্কোর আগামী জুন মাসের শেষ নাগাদ হতে পারে ৭৫ দশমিক ৯ পয়েন্ট। সেই তুলনায় উৎপাদন খাতের স্কোর দাঁড়াতে পারে ৮০ পয়েন্ট। তিনি আরও বলেন, সেবা খাতের পরিচালন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধানের মাধ্যমে এ পরিস্থিতির কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা যেতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এছাড়া প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তাদের তুলনায় নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় আস্থা কম পরিলক্ষিত হওয়ায় এ থেকে উত্তরণেও কাজ করতে হবে বলে জানান তিনি।

মূলত বিল্ড এ বছরের বিজনেস কনফিডেন্স জরিপে সাতটি বিষয়ের মধ্যে ছয়টিতেই উন্নতি দেখা গেছে। এ ছয়টি বিষয় হলো কর্মসংস্থান, ক্রয়াদেশ, সেবার চাহিদা, ব্যবসায় কার্যক্রম, বিক্রয়মূল্য ও বিনিয়োগ। শুধু ব্যবসায় ব্যয় সম্পর্কিত মতামতের ক্ষেত্রে নেতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।

জরিপ বলছে, ব্যবসা পরিচালনার বিভিন্ন ব্যয় বাড়তে থাকায় চলতি বছরের জুনের শেষ নাগাদ এই সূচক দাঁড়াতে পারে ২২ দশমিক ৪ শতাংশে। ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, তৈরি পোশাক খাতে ব্যয়সংক্রান্ত এই সূচক এখনই দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩ পয়েন্টে, যা এই জরিপের সর্বনি¤œ স্কোর। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, অফিস ভাড়া ও অন্যান্য সরঞ্জাম সংগ্রহসংক্রান্ত ব্যয়ের বোঝা কমাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, ‘বাংলাদেশ সব ধরনের সংকট কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ। বিল্ডের এই প্রতিবেদন আমাদের সামনের দিনের পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে।’ এর আগে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বিল্ডের নির্বাহী পরিচালক নিহাদ কবির বলেন, ‘গত এক দশকে আমাদের বেসরকারি খাতে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশ কয়েকটি নতুন সমস্যার ও সৃষ্টি হয়েছে। সেগুলো থেকে উত্তরণের রাস্তা এখনই করতে হবে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য নানামুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, বিল্ডের এই জরিপ নীতিনির্ধারকদের সহায়তা করবে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের জন্য।’

অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স ( ডিসিসিআইয়ের) সভাপতি মো. সামির সাত্তার বলেন, ‘বিল্ডের এ কাজটি একটি গবেষণামূলক কাজ, যা করা হয়েছে ব্যবসায়ীদের মতামত নিয়ে এবং এ কাজের সঙ্গে বর্তমান ব্যবসার পরিস্থিতির মিল রয়েছ অনেক। এখন ব্যবসায়ীরা বেশি ভাবছেন তাদের উৎপাদন খরচ নিয়ে যা এই প্রতিবেদনেও ওঠে এসেছে। আশা করছি, এ প্রতিবেদনে গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারকরা নীতিমালা প্রণয়ন করবেন।’

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিল্ডের লজিস্টিকস ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কিং কমিটির কো-চেয়ার আবুল কাসেম খান, ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপাল অঞ্চলের কান্ট্রি ম্যানেজার মার্টিন হল্টম্যান, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান এ এইচ এম আহসান, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী সদস্য মহসিনা ইয়াসমীন ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ ফয়েজুল আমীন প্রমুখ।  

Leave a Reply