বন্যার পর হাকালুকিতে বেড়েছে মাছের উৎপাদন

বন্যার পর হাকালুকিতে বেড়েছে মাছের উৎপাদন

গত বছরের বন্যার পর দেশের অন্যতম বৃহত্তর মাছের উৎস হাকালুকি হাওরে উল্লেখযোগ্য হারে মাছের উৎপাদন বেড়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, হাকালুকিতে মাছের উৎপাদন বেড়েছে গড়ে ৫ থেকে ৭ শতাংশ। আশা করা হচ্ছে, এ বছর উৎপাদন অন্তত ৪,০০০ টন বৃদ্ধি পাবে।

মৎস্য বিভাগ সূত্রের বরাতে জানা যায়, বাংলাদেশের বড় হাওর হাকালুকি দেশের ৪টি মাদার ফিসারিজের অন্যতম। প্রতি বছর এ হাওরের মাছ স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যায়। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে এ হাওরে মাছের গড় উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার টন। কিন্তু ২০১৭ সালের বন্যার পরেই মাছের উৎপাদন নতুন রেকর্ড করে ১৭ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়ায়।

তবে এরপরে আবারও কমে কমে যায় উৎপাতন। ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে জেলায় মাছের উৎপাদন ছিল ৪৮ হাজার ১১২ মেট্রিক টন। এরমধ্যে হাওরে উৎপাদন ১০ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার ৫১৮ মেট্রিক টন। এরমধ্যে হাওরে উৎপাদন ছিল ১২ হাজার ৯৮১ মেট্রিক টন। ২০২০-২১ অর্থ বছরে ৫১ হাজার ৫৫২ মেট্রিক টন; এরমধ্যে হাওরে ২০ হাজার ৯৭৭ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ অর্থ বছরে উৎপাদন হয় ৫২ হাজার ৩২৫ মেট্রিক টন। এরমধ্যে হাওরে উৎপাদন হয়েছিল ২৪ হাজার ২৪০ মেট্রিক টন।

চলতি ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে হাওরে মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যে মাত্রা ২৮ হাজার মেট্রিক টন এবং জেলায় উৎপাদনের লক্ষোমাত্রা ৫৩ হাজার ১০৯ মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হয়েছে।

মৎস কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরে ইতোমধ্যেই ৫ থেকে ৭ শতাংশ উৎপাদন বেড়েছে, বছরের শেষ নাগাদ এই বৃদ্ধি ১০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

হাওর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে হাকালুকির বিভিন্ন বিলে মাছ ধরার উৎসব চলছে। বিভিন্ন আকারের মাছের পাশাপাশি ২০ থেকে ৩০ কেজি ওজনের মাছও ধরা পড়ছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, একদিনে কোটি টাকার ওপরে মাছ বিক্রি হচ্ছে। ধরা পড়ছে বড় বড় মাছ। হাওরের জুড়ী, কুলাউড়া ও বড়লেখা উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, বিলের পাড়ে অস্থায়ী নিলাম কেন্দ্র স্থাপন করেছেন ইজারাদাররা। সেখানে ভোর থেকে ব্যবসায়ীরা মাছ কেনার জন্য ভিড় করছেন। ইজারাদারদের অধীনে জেলেরা সারাদিন বিলে জাল ফেলে মাছ ধরছেন। কিছুক্ষণ পরপর সেই মাছ নৌকায় করে ঘাটের নিলাম কেন্দ্রে নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। ছোট ও বড় মাছ আলাদা করে বিক্রি করা হচ্ছে ঘাটে।

বিগত বছরের চাইতে চলতি মৌসুমে হাওরে মাছের উৎপাদন বেশি বলে জানান জেলেরা। তবে অনিয়ন্ত্রিত মাছ আহরণ ও বিলগুলো ভরাট না হলে প্রতিবছর শুধু হাওরেই মাছ উৎপান হতো দ্বিগুণ।

হাওরে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখাসহ হাওরে মাছের স্থায়ী অভয়াশ্রম বৃদ্ধি করা জরুরি। জেলেরা বলছেন, হাওর রক্ষায় সরকার এখনি বিল খনন না করলে মাছের উৎপাদন কমে যাবে, বিলগুলো ভরে সমতল হয়ে যাবে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার তথ্যমতে, আগে এই হাওরে ছিল ২৩৮ টি বিল, আর বর্তমানে রয়েছে প্রায় ২০০টি। অর্থাৎ ৩৮ টি বিল ইতোমধ্যেই ভরাট গেছে অথবা ছোট হওয়ায় অন্য বিলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

বিল ইজারাদার মো. জমির আলী জানান, ২৮ হাজার হেক্টরের বিশাল হাওরে ছোটবড় বিল রয়েছে ২৩৮টি। তবে নানামুখী আগ্রাসনের ফলে হাওর হারাচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণ ও বিলগুলো ভরাট হচ্ছে দিনেদিনে। ফলে কাঙ্ক্ষিত মাছ মিলছে না হাওরে।

ইজারাদার হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, “যদি হাওরকে সঠিকভাবে রক্ষা করা যেত, তাহলে মাছের উৎপাদন দ্বিগুণ হত। হাকালুকি হাওরের মাছের স্বাদ বেশি থাকায় সারাদেশে এর চাহিদা আছে, কিন্তু দিনে দিনে মাছের উৎপাদন কমছে নানান কারণে। এ নিয়ে বারবার কথা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছেনা।”

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহম্মদ মিজানুর রহমান জানান, ২০২২ সালে সিলেটে আকস্মিক বন্যার কারণে এ বছর হাওরে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ। তবে হাওরে নানামুখী আগ্রাসনের কথা স্বীকার করে আগামীতে মৎস্যসম্পদ উৎপাদন বৃদ্ধিতে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

“গত বছর (২০২১-২০২২) মৌলভীবাজারে ৫২,৩২৫ মেট্রিকটন মাছ উৎপাদিত হয়েছিল। চলতি মৌসুমে ৫৩,১০৯ মেট্রিকটন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের বড় হাওর হাকালুকি দেশের ৪টি মাদার ফিসারিজের অন্যতম। গত বছরের মত এবছরও দেখা মিলছে বিপন্নপ্রায় অনেক প্রজাতির মাছের। যার মধ্যে সংকটাপন্ন ১৩ প্রজাতির মাছ এবং চরম বিপন্ন ৮ প্রজাতির মাছ রয়েছে।”

Leave a Reply