‘বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশিরাই প্রাণের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’

‘বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশিরাই প্রাণের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’

ক্ষুদ্র পরিসরে যাত্রা শুরু করে বর্তমানে ৩১টির বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের। ‘প্রাণ’-এর পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বিশ্বের ১৪৫টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা। বিদেশিরা পরিচিত হচ্ছে বাংলা নামক মিষ্টি ভাষাটির সঙ্গে। অনেক দেশে হচ্ছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চাও।

প্রাণ-এর পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা। ভাষার মাসে এই অর্জন নিয়ে জানতে চাই।

আহসান খান চৌধুরী: ‘প্রাণ’ শব্দটির দিকে লক্ষ করলেই বোঝা যায় বাংলা ভাষার শব্দগুলো কতটা মধুর। ‘প্রাণ’ সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। বিদেশি গ্রাহকেরা আমাদের ব্র্যান্ডের নামের উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে চান। আমরা বলি, এটি বাংলাদেশের বহুল ব্যবহৃত শব্দ, যা প্রিয় মানুষকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় এবং এটি ইংরেজি শব্দ ‘হার্ট’-এর বাংলা প্রতিশব্দ। যখন বাংলার বহুল ব্যবহৃত সবচেয়ে প্রিয় একটি শব্দ আমরা বিশ্বে তুলে ধরছি, তখন মূলত সেটি বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশকে তুলে ধরছে। এটি বাংলাদেশের প্রাণ-এর নয় বরং বাংলা ভাষাভাষী সবার অর্জন। কারণ, তাদের মুখের একটি শব্দ এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি ব্র্যান্ড।

বিদেশের মাটিতে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে প্রাণ-এর পণ্য—ব্যাপারটা আপনাদের কীভাবে আন্দোলিত করে?

আহসান খান চৌধুরী: আমরা দেখেছি, বাংলা ভাষাভাষী ও বাংলাদেশের মানুষের কাছে ‘প্রাণ’ একটি আবেগের নাম। এটি এমনিতেই একটি বাংলা শব্দ, তার ওপর বাংলাদেশের একটি ব্র্যান্ড। সুতরাং কোনো বাংলাদেশি যখন বিদেশের মাটিতে ‘প্রাণ’-এর পণ্য দেখে, তখন সে বিক্রয়কর্মী এবং স্থানীয়দের কাছে গর্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে এটি আমার দেশের ‘প্রাণ’, তখন সেই ভালো লাগা মুখে প্রকাশ করা যায় না।

 আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে দিতে প্রাণের কোনো ব্যবসায়িক পদক্ষেপ কি আছে?

আহসান খান চৌধুরী: বিভিন্ন দেশে প্রাণ-এর পরিবেশকদের যে অফিস আছে, সেখানে আমরা প্রতিবছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করি। র‌্যালি, আলোচনা সভা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ নানা আয়োজনে মাতৃভাষাকে আমরা বিশ্বের নানান ভাষাভাষী মানুষের কাছে তুলে ধরছি।

প্রাণ-এর শুরুর গল্পটা তো কমবেশি অনেকেই জানেন। ছোট্ট একটি উদ্যোগ থেকে অন্যতম বৃহৎ গ্রুপ অব কোম্পানি হয়ে ওঠার এই যাত্রায় বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষার প্রতি কী ধরনের দায়বদ্ধতা আপনারা অনুভব করেন?

আহসান খান চৌধুরী: দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই আমরা বিশ্বের বুকে বাংলা ভাষাকে তুলে ধরতে নানান আয়োজন করে যাচ্ছি। তবে আরও অনেক কাজের সুযোগ রয়েছে। আমরা পরিকল্পিতভাবে বিশ্বে বাংলা ভাষাকে তুলে ধরতে আগামী দিনে আরও কাজ করব।  

বিশ্বের প্রায় ১৪৫টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে প্রাণ-এর পণ্য। বিদেশের মাটিতে ব্র্যান্ড হিসেবে ‘প্রাণ’ বাংলাদেশকে কীভাবে উপস্থাপন করছে?

আহসান খান চৌধুরী: আমাদের রপ্তানির শুরুর দিকে ছিল শুধু বাংলাদেশের মানুষের কাছে ‘প্রাণ’-এর পণ্য পৌঁছে দেওয়া। তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা এবং প্রত্যেক বাংলাদেশিই যেন প্রাণ-এর ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ হয়—সে লক্ষ্যে কাজ করা। আর সেটি তখনই সম্ভব হয় যখন বাংলাদেশি সব মানুষ পণ্যটিকে ভালোভাবে গ্রহণ করে। তারপর ‘প্রাণ’কে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বাংলাদেশিই এখন একেকজন প্রাণ-এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করেছে। এখন বিভিন্ন দেশের স্থানীয় লোকজন প্রাণের পণ্য ব্যাপকভাবে গ্রহণ করছে। বিদেশি নামীদামি সুপারশপে প্রাণ-পণ্য যাচ্ছে এবং সেখান থেকে স্থানীয় ক্রেতারা তা গ্রহণ করছে এবং বাংলাদেশে উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের প্রশংসা করছে। এটি আমাদের জন্য একটি বড় অর্জন।

প্রাণ-এর অধিকাংশ পণ্যই খাবারজাতীয়, ক্ষতিকারক কেমিক্যাল এড়ানোর জন্য আপনারা কী কী সতর্কতা অবলম্বন করেন?

আহসান খান চৌধুরী: স্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্য গ্রহণে মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। পণ্যের প্রতি ভোক্তার আস্থার প্রতিদান দিয়ে আমরা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি কোনায় ছড়িয়ে পড়ছি। খাদ্যপণ্য কতটা ভালো ও মানসম্মত হবে সেটি নির্ভর করে কাঁচামালের উৎসের ওপর। আমরা এ জন্য চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদে মনোযোগী হয়েছি। এখন আমাদের এক লাখের অধিক চুক্তিভিত্তিক খামারি রয়েছে, যাদের কাছ থেকে পরিকল্পিত চাষাবাদের সুফল পাচ্ছি। এরপর কারখানা পর্যায়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের গুণাগুণ পরীক্ষা করা হচ্ছে। আমাদের নিজস্ব ল্যাব রয়েছে, সেখানে পণ্য পরীক্ষা করা হয়। এরপর এটি ভোক্তার কাছে পৌঁছে যায়। সুতরাং আমরা চেষ্টা করছি প্রতিনিয়ত উন্নতি করতে এবং ভোক্তার ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে পণ্য পৌঁছে দিতে।

বিদেশি গ্রাহকদের প্রাণ-এর পণ্য ব্যবহার নিয়ে সন্তুষ্টি বা প্রত্যাশা কেমন?

আহসান খান চৌধুরী: সারা বিশ্বে প্রাণ-এর ভোক্তা ১৫০ কোটির বেশি। এর মধ্যে দেশের মানুষ ও বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি বাদ দিলে বাকি সবাই বিভিন্ন দেশের ভোক্তা, যারা নিয়মিত প্রাণ-এর পণ্য গ্রহণ করছে। আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপে প্রাণ-এর ফ্রোজেন ফুডস, কনফেকশনারি, সুগন্ধি চালের বড় বাজার তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রাণ-এর নুডলস, জুস, ওয়েফার, বিস্কুটের ব্যাপক বাজার তৈরি হয়েছে। স্থানীয় ভোক্তাদের আস্থা অর্জনের ফলে এটি সম্ভব হয়েছে।  

প্রাণ-পরিবারের সদস্যসংখ্যা তো বিশাল। এত জনবল থেকে সঠিকভাবে কাজটা বের করে আনার বিষয়টি আপনারা কীভাবে সম্পন্ন করেন? দেশপ্রেম একটি বড় বিষয়। দেশের এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে তাদের কেমন প্রতিক্রিয়া?

আহসান খান চৌধুরী: আমাদের প্রতিষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি। বর্তমানে গ্রুপের অধীন ১ লাখ ৪৫ হাজারের অধিক মানুষ কাজ করছে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, দেশে হয়তো এখন প্রায় প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ বা তার আত্মীয়স্বজন প্রাণ-আরএফএল পরিবারে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কাজ করছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রতিটি বিভাগে একটি চেইন অব কমান্ডে কাজ হয়। আমার বাবা সেনাবাহিনীতে কাজ করার সুবাদে আমাদের প্রতিষ্ঠানেও তিনি শুরু থেকে একটি চেইন অব কমান্ড তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। সুতরাং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে।  

নতুন কোন কোন দেশে প্রাণের পণ্য রপ্তানির পরিকল্পনা বা প্রক্রিয়া চলছে?

আহসান খান চৌধুরী: আমরা প্রতিনিয়ত প্রাণ-পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে কাজ করছি। আমরা আগামী দিনে আফ্রিকা, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে ব্যাপকভাবে রপ্তানি বাড়াতে কাজ করছি। এ লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের মেলায় নিয়মিত অংশ নিচ্ছি এবং নানাভাবে আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছি।

প্রাণ-এর বিশ্ব জয়ের যাত্রা শুরুর গল্পটা কেমন ছিল?

আহসান খান চৌধুরী: শুরুটা হয়েছে ১৯৯৭ সালে, ফ্রান্সে ক্যানে করে স্লাইস আনারস রপ্তানির মাধ্যমে। ছোট একটি বিক্রয়াদেশ, মাত্র ১১০০ ইউএস ডলার। সে সময় আমরা বিভিন্ন দেশে পণ্য পাঠাতে যোগাযোগ অব্যাহত রাখি। একই বছর ভারতে চানাচুর পাঠাতে সক্ষম হই। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে প্রাণ পণ্য যাওয়া শুরু হয়। এভাবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণ-এর পণ্য।

এ পর্যায়ে আসতে কী কী চ্যালেঞ্জ পাড়ি দিতে হয়েছে?

আহসান খান চৌধুরী: রপ্তানির শুরুর দিকে প্রচুর ক্রেতার দোরগোড়ায় আমাকে যেতে হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন দেশে গাড়ি ভাড়া করে দোকানে দোকানে গিয়ে পণ্য বিক্রি করেছি। অনেক ক্ষেত্রে সুপারশপে গিয়ে তাদের মালিককে রাজি করিয়ে পণ্য দিয়ে এসেছি। সেই সুপারশপের মালিকদের অনেকেই এখন সে দেশে প্রাণ-এর একমাত্র পরিবেশক।  

আপনাদের ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা কী? এবং বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষাকে বিশ্বজুড়ে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন?

আহসান খান চৌধুরী: এককথায় বললে, বিশ্বের প্রতিটি কোনায় কোনায় প্রাণ-পণ্য ছড়িয়ে দিতে সব ধরনের উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছি। আমরা বিভিন্ন দেশে ব্র্যান্ড উন্নয়নে কাজ করছি। এতে বাংলাদেশের ‘প্রাণ’ প্রতিটি কোনায় ছড়িয়ে পড়া মানে বাংলাদেশ সেখানে পৌঁছে যাওয়া, বাংলা ভাষাও ছড়িয়ে পড়া।

আপনাকে ধন্যবাদ।

আহসান খান চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

Leave a Reply