অগ্রাধিকার ও বড় প্রকল্পে ধীরগতি, কমছে বরাদ্দ

অগ্রাধিকার ও বড় প্রকল্পে ধীরগতি, কমছে বরাদ্দ

 সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের প্রভাব পড়েছে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে। গেল জানুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে কম। অর্থ সংকট ছিল না– এমন প্রকল্পের অগ্রগতিও আশানুরূপ নয়। অগ্রাধিকার পাওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর কাজও চলছে ঢিমেতালে। ব্যয় করতে না পারায় বিদেশি ঋণের অর্থছাড় কমে গেছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণের প্রতিশ্রুতিও কমেছে। এ পরিস্থিতিতে ফাস্টট্র্যাকভুক্ত এবং বিভিন্ন বড় প্রকল্পের বরাদ্দেও কাটছাঁট হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, কাটছাঁটের পর স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নসহ আরএডিপির আকার দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। এই অর্থবছরে মূল এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল এডিপি থেকে বরাদ্দ কমছে ১৯ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। বিদেশি ঋণ এবং অনুদানের উৎসের অর্থায়ন থেকে এ বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। স্থানীয় উৎসের বরাদ্দে কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। এর বাইরে থোক বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৩ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা।

আরএডিপি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, মূল এডিপির তুলনায় সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ অনেক কম চেয়েছে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। এডিপি এবং আরএডিপিতে বরাদ্দ চাহিদার এত বেশি ব্যবধান আগে কখনও দেখা যায়নি। এ কারণে আরএডিপিতে বড় অঙ্কের থোক রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণে গত সাত মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার অত্যন্ত কম থাকায় এমনটি হয়েছে। সরকারের কৃচ্ছ্র নীতির কারণে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কিছু কেনাকাটা বন্ধ রয়েছে। এসব কারণে এবার এডিপি বাস্তবায়নে গতি অনেক কম। বরাদ্দ কমানো-বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন অগ্রগতি বিবেচনা করা হয়েছে বলে জানান তিনি। আজ বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে সংশোধিত এডিপি চূড়ান্ত হতে পারে। একনেক চেয়ারপারসন হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে সভাপতিত্ব করার কথা রয়েছে।

সার্বিক বাস্তবায়ন পরিস্থিতি: পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ২৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল ৩০ দশমিক ২১ শতাংশ। গত এক যুগের মধ্যে আর কোনো অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এত কম হারে বাস্তবায়ন হতে দেখা যায়নি। সরকারের অগ্রাধিকার পাওয়া বেশ কিছু ফাস্টট্র্যাক ও বড় প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি আরও ধীর। এ কারণে বরাদ্দ কমানো হচ্ছে আরএডিপিতে।

প্রকল্পে বিদেশি অর্থ ছাড় কমেছে: বাস্তবায়নের হার কম থাকায় বিভিন্ন প্রকল্পে কমেছে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ ছাড়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে বিদেশি ঋণের অর্থ ছাড় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৯ শতাংশ কম। মোট ৪২৬ কোটি ডলার অর্থ ছাড় করেছে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীরা। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৪৬৯ কোটি ডলার। এ সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে কমেছে ৬২ শতাংশেরও বেশি। চলতি অর্থবছর উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে ৯২ হাজার ২০ কোটি টাকা পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল সরকারের।

বরাদ্দ কমছে ফাস্টট্র্যাক ও বড় প্রকল্পে: পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সংশোধিত এডিপিতে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের ঘুনধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হচ্ছে ৪৩০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে মূল এডিপিতে ফাস্টট্র্যাকভুক্ত এ প্রকল্পটির বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। আরএডিপিতে দেওয়া হচ্ছে ১ হাজার ২০ কোটি টাকা। গত জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ৪১ শতাংশ। অথচ আগামী বছরের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ২০১০ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। একই অবস্থা মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের। প্রকল্পটিতে চলতি অর্থবছরের মূল এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ৮৩৭ কোটি টাকা। সেখান থেকে ৭৪৩ কোটি টাকাই ছেঁটে ফেলা হচ্ছে। সংশোধিত এডিপিতে এখন বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে মাত্র ৯৪ কোটি টাকা। অর্থবছরের সাত মাসে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৫৮ শতাংশের কিছু কম। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা। ফাস্টট্র্যাক প্রকল্পের মধ্যে বরাদ্দ বাড়ছে দুটিতে। এর একটি পদ্মা বহুমুখী সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প। এর আর্থিক অগ্রগতি ৬৭ শতাংশ। একবার সংশোধনের পর প্রকল্পটির কাজ আগামী বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা। বাস্তবায়নে হাতে কম সময় থাকার পরও সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ বাড়ানো বাড়ছে ১০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ৫ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা। আর এডিপিতে তা দাঁড়াচ্ছে ৫ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। রাজধানীর যানজট লাঘবে নেওয়া ঢাকা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের (লাইন-৬) অগ্রগতি মোটামুটি সন্তোষজনক। আরএডিপিতে ফাস্টট্র্যাকের এই প্রকল্পের বরাদ্দও বাড়ছে। মূল এডিপির তুলনায় বাড়তে পারে ১৬৬ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি ৬৩ শতাংশ। আগামী বছরের জুনে প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা। ফাস্টট্র্যাকের বাইরে বেশ কিছু প্রকল্পের বরাদ্দ মূল এডিপির চেয়ে কমছে সংশোধিত এডিপিতে। মেট্রোরেল-১ প্রকল্পের বরাদ্দ কমছে ১ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। বরাদ্দ কাটছাঁটের পর সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পটির বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে ৪৮৩ কোটি টাকা। এই অর্থবছের মূল এডিপিতে প্রকল্পটির বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেল সেতু প্রকল্পের বরাদ্দ কমছে ১ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। এডিপিতে প্রকল্পটির বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। আরএডিপিতে তা কমে দাঁড়াচ্ছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। সাউথ এশিয়া সাবরিজিওনাল ইকোনোমিক কোঅপারাশেন (সাসেক) ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হচ্ছে ১৫৫ কোটি টাকা। মূল এডিপিতে প্রকল্পটির বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। আরএডিপিতে বরাদ্দ থাকছে ৯১৩ কোটি টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

এডিপির বাস্তবায়ন পরিস্থিতি ও কাটছাঁটের এসব প্রস্তাব সম্পর্কে সামগ্রিক মূল্যায়ন জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, অর্থ সরবরাহ, বাস্তবায়ন পরিস্থিতি ও রিজার্ভে সংকটের যে বাস্তবতা, তাতে স্থানীয় উৎসের চেয়ে বিদেশি ঋণের ব্যবহার বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, পাইপলাইনে থাকা ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ অব্যবহৃত আছে। বিপুল পরিমাণের এই অর্থ ব্যবহার বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। অথচ সংশোধিত এডিপির খসড়ায় করা হয়েছে একেবারেই তার উল্টো। স্থানীয় উৎসে না করে বিদেশি ঋণের ওপর কাটছাঁট করা হচ্ছে।

Leave a Reply