গ্রাহক পর্যায়ে টানা ৩ মাস বাড়ল বিদ্যুতের দাম

গ্রাহক পর্যায়ে টানা ৩ মাস বাড়ল বিদ্যুতের দাম

পূর্ব ঘোষণার জেরে টানা বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুতের দাম। চলতি মাস নিয়ে তিন মাসে টানা তৃতীয় বার বাড়ল গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইনের আওতায় গতকাল মঙ্গলবার এ ঘোষণা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এবার গ্রাহক পর্যায়ে (খুচরা) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে প্রায় ৩৯ পয়সা বা পাঁচ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এতে প্রতি ইউনিটের দাম বেড়ে হলো আট টাকা ২৫ পয়সা।

এর আগে ফেব্রুয়ারিতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম পাঁচ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। সে সময় ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম দাঁড়ায় গড়ে সাত টাকা ৮৬ পয়সা। এর আগে জানুয়ারিতেও পাঁচ শতাংশ বাড়ানো হয় বিদ্যুতের দাম। সে সময় গড় দাম বেড়ে দাঁড়ায় সাত টাকা ৪৯ পয়সা, যা ডিসেম্বরে ছিল সাত টাকা ১৩ পয়সা। এছাড়া গত ডিসেম্বরে বাল্ক বিদ্যুতের দাম প্রায় ২০ শতাংশ ও ফেব্রুয়ারিতে আট শতাংশ বাড়ানো হয়।

গতকাল দাম বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন জারি করে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে দেখা যায়, মার্চে আবাসিক (সাধারণ) গ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম চার টাকা ৬২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে চার টাকা ৮৫ পয়সা, দ্বিতীয় ধাপে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিটের জন্য ছয় টাকা ৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ছয় টাকা ৬৩ পয়সা, তৃতীয় ধাপে ২০১ থেকে ৩০০ পর্যন্ত ইউনিটের জন্য ছয় টাকা ৬২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ছয় টাকা ৯৫ পয়সা, চতুর্থ ধাপে ৩০১ থেকে ৪০০ পর্যন্ত ইউনিটের জন্য ছয় টাকা ৯৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে সাত টাকা ৩৪ পয়সা, পঞ্চম ধাপে ৪০১ থেকে ৬০০ পর্যন্ত ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৯৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৫১ পয়সা এবং ষষ্ঠ ধাপে ৬০০ ইউনিটের ওপরে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের দাম প্রতি ইউনিটে ১২ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ২৬ পয়সা করা হয়েছে।

এর আগে ডিসেম্বরে শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর জন্য প্রতি ইউনিটের দাম ছিল চার টাকা ১৯ পয়সা ও জানুয়ারিতে চার টাকা ৪০ পয়সা, ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিটের জন্য ডিসেম্বরে ছিল পাঁচ টাকা ৭২ পয়সা ও জানুয়ারিতে ছয় টাকা ০১ পয়সা, ২০১ থেকে ৩০০ পর্যন্ত ইউনিটের জন্য ডিসেম্বরে ছিল ছয় টাকা ও জানুয়ারিতে ছয় টাকা ৩০ পয়সা, ৩০১ থেকে ৪০০ পর্যন্ত ইউনিটের জন্য ডিসেম্বরে ছিল ছয় টাকা ৩৪ পয়সা ও জানুয়ারিতে ছয় টাকা ৬৬ পয়সা, ৪০১ থেকে ৬০০ পর্যন্ত ইউনিটের জন্য ডিসেম্বরে ছিল ৯ টাকা ৯৪ পয়সা ও জানুয়ারিতে ১০ টাকা ৪৪ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের ওপরে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য এর দাম ডিসেম্বরে ছিল প্রতি ইউনিটে ১১ টাকা ৪৬ পয়সা ও জানুয়ারিতে ১২ টাকা ০৩ পয়সা।

তিন মাসের দাম বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতি মাসে পাঁচ শতাংশ হারে বাড়ালেও তিন মাসে বিদ্যুতের দাম মোট বেড়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ৭১ শতাংশ।

আবাসিকের বাইরে কৃষিকাজে বা সেচে সরবরাহকৃত বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি চার টাকা ৫৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে চার টাকা ৮২ পয়সা করা হয়েছে। আর ক্ষুদ্রশিল্প প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুতের দাম অফপিক আট টাকা ৪৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে আট টাকা ৮৮ পয়সা, পিক সময়ে ১১ টাকা ২৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৮৫ পয়সা, আর ফ্ল্যাট রেটের ক্ষেত্রে ৯ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৮৮ পয়সা করা হয়েছে।

এদিকে শিল্প খাতে মধ্যম চাপ (১১ কেভি) বিদ্যুতের দাম ফ্ল্যাট রেট ৯ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৯০ পয়সা, অফপিক সময়ে আট টাকা ৪৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে আট টাকা ৯১ পয়সা, আর পিক সময়ের ক্ষেত্রে ১১ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা ৩৭ পয়সা করা হয়েছে। একইভাবে উচ্চচাপ (৩৩ কেভি) ও অতি উচ্চচাপ (১৩২ কেভি ও ২৩০ কেভি) গ্রাহকদের বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০১০ সালের মার্চ থেকে এ নিয়ে ১২তম বার বাড়ানো হলো গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম। এর মধ্যে ২০১০ সালের মার্চে প্রথম বিদ্যুতের দাম পাঁচ শতাংশ বাড়ানো হয়। সে সময় বিদ্যুতের গড় দাম বেড়ে দাঁড়ায় তিন টাকা ৯২ পয়সা। পরের বছর (২০১১ সাল) গ্রাহক পর্যায়ে দুই দফা বাড়ানো হয় বিদ্যুতের দাম। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে বাড়ানো হয় পাঁচ শতাংশ ও ডিসেম্বরে ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। এতে বিদ্যুতের গড় দাম বেড়ে দাঁড়ায় চার টাকা ৬৭ পয়সা।

২০১২ সালেও খুচরা বিদ্যুতের দাম দুই দফা বাড়ানো হয়। এর মধ্যে মার্চে বাড়ে সাত দশমিক ০৯ শতাংশ ও সেপ্টেম্বরে ১৫ শতাংশ। এতে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে বিদ্যুতের গড় মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ টাকা ৭৫ পয়সা। এরপর ২০১৪ সালের মার্চে বিদ্যুতের দাম ছয় দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয় ছয় টাকা ১৫ পয়সা। আর ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তা দুই দশমিক ৯৩ শতাংশ বেড়ে হয় ছয় টাকা ৩৩ পয়সা।

এদিকে ২০১৭ সালে ডিসেম্বরে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম পাঁচ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ানো হয়। সে সময় বিদ্যুতের গড় মূল্যহার ছয় টাকা ৮৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ওইবারই প্রথম বিদ্যুৎ বিতরণকারী সব কোম্পানির জন্য অভিন্ন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়। এতে ঢাকার চেয়ে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের দাম বেশি হারে বাড়ে। এর প্রভাবে গড় মূল্যহার কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল গড়ে ছয় টাকা ৭৭ পয়সা।

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহকৃত বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল তিন টাকা ৭৩ পয়সা। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট টাকা ২৫ পয়সা। অর্থাৎ ১৩ বছরে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে চার টাকা ৭৫ পয়সা বা ১২১ দশমিক ১৮ শতাংশ।

Leave a Reply