বিমা খাতের দুর্বলতাঃ উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ—দুটোতেই বড় ঘাটতি

বিমা খাতের দুর্বলতাঃ উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ—দুটোতেই বড় ঘাটতি

অর্থনীতির অন্য খাতগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের বিমা খাতের তেমন অগ্রগতি হচ্ছে না। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লেখাচ্ছে আর তিন বছর পর। অথচ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় এ খাতের অবদান এখনো ১ শতাংশের নিচে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) না পারছে বিমা খাতের উন্নয়ন ঘটাতে, না পারছে তার আওতাধীন কোম্পানিগুলোকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে। ফলে যে বিশৃঙ্খল ছিল বিমা খাত, ওই অবস্থাতেই আছে এখনো।

দেশের বিমা খাতকে ঠিকমতো পরিচালনা করতে পারছিল না বিমা অধিদপ্তর। অন্য দেশের বিমা খাত অর্থ মন্ত্রণালয়ে থাকলেও দেশে তা ছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিরোধিতা সত্ত্বেও ২০০৮ সালের নভেম্বরে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার খাতটিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতায় নিয়ে আসে।

অন্তত ৩০ শতাংশ গ্রাহক বিমা দাবি পাচ্ছেন না। তবে বিমা খাতের সব সমস্যাই চিহ্নিত করা হচ্ছে।

মোহাম্মদ জয়নুল বারী, আইডিআরএ চেয়ারম্যান

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার বিমা খাতের জন্য দুটি আইন করে, যা ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের করা দুটি অধ্যাদেশের ধারাবাহিকতা। বিমা অধিদপ্তর বিলুপ্ত হয়ে ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে আলাদা সংস্থা হিসেবে যাত্রা শুরু করে আইডিআরএ।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তবে গত সোমবার তিনি সংবাদ সম্মেলন করেই জানান, অন্তত ৩০ শতাংশ গ্রাহক বিমা দাবি পাচ্ছেন না। তবে বিমা খাতের সব সমস্যাই চিহ্নিত করা হচ্ছে।

এ বাস্তবতা সামনে রেখেই আজ ১ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের আয়োজনে দেশব্যাপী জাতীয় বিমা দিবস পালনের আয়োজন করা হয়েছে। মূল অনুষ্ঠান হচ্ছে ঢাকার আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ দিবসের উদ্বোধন করবেন। এবারের প্রতিপাদ্য, ‘আমার জীবন আমার সম্পদ, বিমা করলে থাকবে নিরাপদ।’

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ। বিমা শিল্পের ওপর বক্তব্য দেবেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী ও বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি শেখ কবির হোসেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৬০ সালের ১ মার্চ আলফা ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার স্মৃতি ধরে রাখতেই আজকের দিনটিকে জাতীয় বিমা দিবস ঘোষণা করে সরকার।

সম্ভাবনা সত্ত্বেও উন্নয়ন কম

আর্থিক পণ্যের প্রসার জমাতে বিমা খাত এখনো অবিকশিত—খাতসংশ্লিষ্ট প্রায় সবাই এ কথার সঙ্গে একমত। এ খাতের মাধ্যমে মানুষকে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব। ব্যাংকের মাধ্যমে বিমা পলিসি চালু, অর্থাৎ ব্যাংকাস্যুরেন্স চালুর মাধ্যমে প্রিমিয়াম আয় দ্বিগুণ, এমনকি তিন গুণও হতে পারে।

মোবাইল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে ছোট আকারের প্রিমিয়াম নিয়েও বিমা খাতের আয় বৃদ্ধির সুযোগ আছে। ১০০ টাকা ফ্লেক্সি করলে ১০ টাকা যদি প্রিমিয়াম আকারে কেটে নেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হয়, তা সমাজের বড় একটা অংশকে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় নিয়ে যেতে পারে।

তৃতীয় পক্ষের যে মোটরবিমা ২০১৮ সালে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে, তা আবার চালু করেও সংগ্রহ করা সম্ভব অন্তত বছরে তিন হাজার কোটি টাকা। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব জীবন তহবিলের টাকায়। বিমা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব সম্ভাবনা দেখছেন।

বাস্তবতা এড়িয়ে আওয়ামী লীগ সরকার কয়েক দফায় বিমা কোম্পানির লাইসেন্স দিয়েছে উদার হস্তে। যদিও আর্থিক খাতের মধ্যে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার যেভাবে এগিয়ে গেছে, বিমা খাত সেভাবে পারেনি। না পারার পেছনে অন্যতম দায়ী নীতি সিদ্ধান্তের অভাব।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক রি ইনস্টিটিউটের ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপিতে ২০২০ সালে বিমা খাতে জীবনবিমার অবদান ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশ এবং নন-লাইফ বিমার শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ। দুটি মিলে শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ। অথচ প্রতিবেশী ভারতে জিডিপিতে বিমার অবদানের পরিমাণ ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। উন্নত দেশগুলোতে এ হার ৯ থেকে ১০ শতাংশের মতো।

বিমা খাতের সঙ্গে ৩৭ বছর ধরে জড়িত মেঘনা লাইফ ইনস্যুরেন্সের চেয়ারম্যান নিজামউদ্দিন আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দক্ষ লোকবল কম। একে শক্তিশালী করা ছাড়া এ খাতের উন্নয়ন হওয়া কঠিন।

লাগামহীন প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেই

বিমা খাতে দুর্নীতি নতুন কোনো বিষয় নয়। সময়মতো গ্রাহকদের বিমা দাবি পরিশোধ না করা, কর ফাঁকি ও ভ্যাট ফাঁকি, কমিশন প্রথার অপব্যবহার, অগ্নিবিমার সুযোগ নিয়ে অন্যায্য অর্থ আদায়, কোম্পানি থেকে টাকা বের করে নিতে পরিচালকদের বহুমাত্রিক ফন্দি, জমি কেনার নামে অর্থ আত্মসাৎ ইত্যাদি অহরহ ঘটছে। আর পুরো বিমা খাতের প্রতি আস্থার সংকট তো আছেই।

আবার অনেক কিছু ঘটছে আইডিআরএর অজান্তেই। গত সপ্তাহে আইডিআরএ নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে বলেছে, তাদের অনুমতি না নিয়েই কোনো কোনো কোম্পানি ব্যাংকের মতো করে মাসিক সুদ বা মুনাফা কর্মসূচি চালু করেছে। আইডিআরএ এসব বন্ধ করতে বলেছে।

বিশেষায়িত খাত হওয়া সত্ত্বেও বিলুপ্ত বীমা অধিদপ্তর যেভাবে সরকারি কর্মচারীদের দিয়ে পরিচালনা করা হতো, সেই যুগ আবার ফিরে এসেছে। সংস্থাটিতে মধ্যম পর্যায়ে প্রেষণে বিমা খাতের বাইরের লোক নিয়োগ দিয়ে আসছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

দেশের ৬১টি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে ৭ হাজারের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারী। আর ৮১টি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক হিসেবে আইডিআরএর জনবল মোটে ১০০ জন, যার মধ্যে বিমা খাতের অভিজ্ঞ জনবল ৫০ জনের কম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক মাইনউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, কিছু বিমা কোম্পানি লাগামহীনভাবে চলছে। সক্ষমতার অভাবে আইডিআরএ তাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারছে না। এ অবস্থার অবসান হওয়া দরকার।

Leave a Reply