লুটপাটে কাবু আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক

লুটপাটে কাবু আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক

লুটপাটে কাবু আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক এবার আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। ভেঙে পড়েছে ঋণ-আমানত শৃঙ্খলাও। ৮৭ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে দীর্ঘদিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চললেও এবার চরম তারল্য সংকটের কারণে গ্রাহকের চাপ নিতে পারছে না ব্যাংকটি। কয়েকদিনের ব্যবধানে ব্যাংকটির পল্টন, কাওরান বাজার ও মৌলভীবাজার শাখার গ্রাহকরা টাকা তুলতে গিয়ে খালি হাতে ফেরত আসার ঘটনা ঘটেছে। গ্রাহক তার জমানো টাকা তুলতে গেলে শাখার কর্মকর্তারা যখন বলেন পরে আসেন-এটি একটি ব্যাংকের জন্য অশনিসংকেত বলে মন্তব্য করেছেন আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, গ্রহকের টাকা সরিয়ে নেওয়া বা লুটপাটের কারণে এমনটি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত সপ্তাহে এ ব্যাংকের মৌলভীবাজার শাখার গ্রাহক আব্দুল হামিদ মাহবুব টাকা তুলতে গেলে তাকে কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। ওই শাখায় তার ১ লাখ টাকা জমা রয়েছে। মাহবুব যুগান্তরকে বলেন, ‘মঙ্গলবার আমি ৫৫ হাজার টাকার চেক নিয়ে ব্যাংকে গিয়েছিলাম। শাখা ম্যানেজার জানান, তাদের কাছে তখন কোনো টাকা ছিল না।’ ওইদিন মৌলভীবাজার শাখার আরও ১৫-২০ জন আমানতকারীর ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে বলে অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, টাকা না পেয়ে সাংবাদিকদের সহায়তা চাই। দুদিন পর (বৃহস্পতিবার) স্থানীয় সাংবাদিকদের সহায়তায় ওই শাখা থেকে মাত্র ২০ হাজার টাকা তুলতে পেরেছি।’

একই পরিস্থিতি ঢাকার পল্টন ও কাওরান বাজার শাখায়ও। শাখা দুটিতে টাকা তোলার জন্য আসা আমানতকারীদের ফেরত যেতে হয়েছে খালি হাতেই। ব্যাংকটির পল্টন শাখায় ২ লাখ টাকা জমা রয়েছে জাকির হোসেনের। বৃহস্পতিবার একটি চেক নিয়ে গেলে তাকে ফেরত আসতে হয় নগদ টাকা ছাড়াই। তিনি বলেন, ‘শাখা ম্যানেজার আমাকে আশ্বস্ত করেন টাকা তুলতে পারব। কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে যে ব্যাংকের ভল্ট খালি।’ গুরুতর তারল্য সংকটে পড়ে ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জামানতমুক্ত তারল্য সহায়তা হিসাবে ৫০ কোটি টাকা চেয়েছিল আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ইতোমধ্যে ব্যাংকটির ৪২৫ কোটি টাকা দেনা থাকায় আবেদনের দুই সপ্তাহ পর তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের অফ-সাইট সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্টকে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায়। কারণ, এটি তারল্য সংকটের কারণে কার্যত বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ব্যাংকটি জমাকৃত আমানত, মূলধনের ঘাটতি, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং তারল্য সংকটের কারণে পদ্ধতিগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা যায়, পরিস্থিতি বর্তমানে খুব নাজুক। ব্যাংকটির কাছে এমন কোনো জামানত নেই, যার বিপরীতে এটি অন্যান্য ইসলামি ব্যাংক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে নগদ অর্থ ধার করতে পারে। এমনকি ব্যাংকটির কর্মীদের বেতনও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত আছি। ব্যাংকের তহবিলের একটি বড় অংশ কিছু লিজিং কোম্পানির কাছে আটকে আছে, যে কারণে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। সেটা উদ্ধারে চেষ্টা করছি। এছাড়া ব্যাংকের মালয়েশিয়ান শেয়ারহোল্ডারকে নতুন করে তহবিল দিতে বলেছি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষের দিকে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ১ হাজার ৮২৩ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে পড়ে। ব্যাংকটির ৭৯০ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঋণের ৮৭ শতাংশই খেলাপি। বর্তমানে তাদের ৩৩টি শাখায় ৩৫০ জন কর্মচারী রয়েছেন। আইসিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, বেশ কিছুদিন ধরে কর্মীদের পুরো বেতন দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ শফিক বিন আব্দুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, আমরা আগে কখনো এমন সংকটে পড়িনি। সব আমানতকারী একই সময়ে টাকা তুলতে আসছেন। যে কারণে তাদের টাকা দিতে হিমশিম খাচ্ছি। এ বছর গ্রাহকদের ৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তারল্য সহায়তা চেয়েছিলাম। কিন্তু এখনো পাইনি। কারণ, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের জামানত হিসাবে কোনো তরল সম্পদ নেই। আশা করি, এ মাসের মধ্যে এই সংকট কেটে যাবে।’

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক যাত্রা শুরু করে ১৯৮৭ সালে, তখন এটি আল-বারাকাহ ব্যাংক নামে পরিচালিত হতো। ১৯৯৪ সালে এটি ‘সমস্যাযুক্ত ব্যাংকে’ পরিণত হয়। তখন ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ত্রুটিযুক্ত ব্যাংকগুলোয় পর্যবেক্ষক নিয়োগের প্রথা চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এরপর ২০০৪ সালে এটি ওরিয়েন্টাল ব্যাংক নামে বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসাবে কার্যক্রম শুরু করে। তবে ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়ার পর ২০০৬ সালের জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে দেয়।

ওরিয়েন্টাল ব্যাংক থেকে আনুমানিক ৩৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৫ ও ২০০৬ সালে ৩৪টি মামলা হয়েছিল। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক এটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষার জন্য ব্যাংকের প্রশাসক হিসাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালককে নিয়োগ দেয়। ২০০৭ সালের আগস্টে ব্যাংকটির অধিকাংশ শেয়ার বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বান করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন এশিয়া ও আফ্রিকায় ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনাকারী সুইস আইসিবি গ্রুপের সঙ্গে দরপত্রে অংশ নেন দুজন দরদাতা। ২০০৮ সালে ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের মতোই নানা অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় চলছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও বেড়েছে অনেক। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। ফলে বাড়ছে নানারকম জালজালিয়াতি, অর্থ পাচার ও আত্মসাতের মতো ঘটনা। এতে নাজুক অবস্থায় পড়েছে পুরো আর্থিক খাত। এ অবস্থা থেকে ফেরাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত করে সুশাসন নিশ্চিত জরুরি। পাশাপাশি ঋণ কেলেঙ্কারির নেপথ্য নায়কদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

জানতে চাইলে বিআইবিএম-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের আজকের পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই দায়ী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভুলনীতির কারণে ব্যাংকটির সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। যখন লুটপাটের শিকার হয়, তখন ব্যাংকটিকে অধিগ্রহণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সে খারাপ অবস্থায় আবার ব্যাংকটিকে বিক্রি করে দেয় মালয়েশিয়ান কোম্পানির কাছে। এরপর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

Leave a Reply